"ধোঁকা"-২

Comments · 919 Views

আফ্রিদী এবার ঢোক গিললো। সেটা দেখে জুলফিকার সামান্য

গাফিলতিটা একটু বেশীমাত্রায়ই হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ব্যপারটা টের পেলেও কিছু করার থাকছে না। বিয়ের দিন তারিখ ঠিক হবার পর থেকে আনিয়াকে সাথে নিয়েই বিয়ের যাবতীয় কেনাকাটা সারছে আফ্রিদী। এর মধ্যে আনিয়ার কিছু আহ্লাদী মাখা আবদারও রাখতে হচ্ছে। কেনাকাটার মাঝেই সে হঠাৎ সেদিন বায়না ধরলো ওকে ডায়মন্ডের নাকফুল কিনে দিতে হবে। বলবেনা ভেবেও আফ্রিদী বলে বসেছিলো, 'তোমার গহনার সেটের সাথে চারটা নাকফুল দিয়েছি। প্রতিটা তোমার শাড়ীর কালারের সাথে সেট করে!' তবে বলে বিশেষ লাভ হয়নি। আনিয়ার যেটা পছন্দ সেটা চাই। আফ্রিদীরও আপত্তি করার কোনো কারন ছিলো না, হাজার হোক হবুবধূ বলে কথা। তাই সাধ্যমতো, কখনো বা সাধ্যাতিরিক্ত হলেও আনিয়ার চাওয়াগুলো পাওয়ায় বদলে দেবার চেষ্টা চলেছে নিরন্তর। এখন শুধু আসমান থেকে চাঁদটা পেরে আনা বাকি। এ তো গেলো একটা দিক! ঐদিকে অফিসেও মারাত্মক গন্ডগোল শুরু হয়েছে। কিছু ফিসফাস আফ্রিদীর কানেও এসেছে। সেই থেকে মনটা অসম্ভব খারাপ হয়ে আছে।
আফ্রিদী নিজেও বুঝতে পারছে নিজেকে এভাবে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়া উচিত হচ্ছে না। এগুলো হলো ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের চাকরী। সকালে হয় তো বিকালে যায়! সেটিও শুধু একজনের মুখের কথায়। জুলফিকার ভুঁইয়া প্রথমবারের মতো ওর ওপর প্রচন্ড রকমের বিরক্ত। গতকাল নিজের রুমে ডেকে আচ্ছামতো বকা দিয়েছে সে। শেষটায় দুহাত ঝাঁকিয়ে বলেছে -
-" হোয়াটস রং উইথ ইউ? দুই লাখ ডলারের বিল তুমি উইদাউট চেকিং এ পাস করলে কিভাবে? এম ডি স্যারকে আমি কি জবাব দেবো? উনি একটু আগেও আমাকে ব্যাঙালোর থেকে মেইল করেছেন। তিনি জানতে চান এই ঘটনার পেছনে কে কে জড়িত। বুঝতে পারছো ব্যপারটা? তিল কিভাবে তাল হয় সেটা এবার দেখবে। এন্ড ইট'ল বি হ্যাপেন্ড জাষ্ট ফর ইউ ব্লাডি ডাফার...!"
চোখ কান বুঁজে ধমক হজম করলো আফ্রিদী। নিজের ডেস্কে এসে দুহাতে মাথা চেপে বসে রইলো কিছুক্ষণ। সে বুঝতে পারছে একটা বড় ভুল হয়ে গেছে। কিন্তু এটা বুঝতে পারেনি যে ভুলটা ওর জন্য এতোবড় অভিশাপ হয়ে দেখা দেবে। অফিস থেকে বেরোনোর আগ মুহূর্তে কামাল যখন ওর ডেস্কে বিলটা নিয়ে আসে তখন সে পরদিন দেবে বলে লকারে রেখে দিতে চেয়েছিলো কারন ভাউচার না দেখে ও বিল সই করতে চায়নি কিন্তু কামাল জানিয়েছিলো ওটা ডিরেক্টর স্যারের বিল। এ এম স্যার এক্ষুণি এটা দেখে দিতে বলেছে। আফ্রিদী তখন সুন্দরী নারীর উষ্ণ সান্নিধ্য পাবার জন্য ব্যাকুল হয়েছিলো। আনিয়াকে নিয়ে সেদিন ডিনারে যাবার কথা। ওর উপর্যুপরি ফোনের তাড়ায় বিষয়টা নিয়ে তখন অতটা ভাবার অবকাশ পায়নি। প্রতিবার বাড়তি সাবধানতা হিসেবে জুলফিকার স্যারের একটা ইনিশিয়াল নিয়ে নেয়। সেদিন জুলফিকার ভুঁইয়া অফিস থেকে আগেই বেরিয়ে গিয়েছিলেন বলে সেটা আর করা সম্ভব হয়নি। তখন 'কিছু হবেনা ' এমন একটা অনুভূতি থেকেই বিলটা ছেড়ে দিয়েছিলো কারন এর আগেও কয়েক কোটি টাকার বিল পাস করেছে সে! কখনো তেমন কিছু হয়নি। হলেও জুলফিকার স্যার সেসব সামলে নিয়েছে। আগুনের আঁচ কখনো আফ্রিদী পর্যন্ত পৌঁছেনি। এবারই বিশ্রী ভাবে ফেঁসে গেছে সে। সেদিন অমন তাড়াহুড়া না করলেও পারতো। আনিয়াটা আসলে খুব পারসুয়েসিভ মেয়ে। নিজের কাজ আদায় করে নিতে ওস্তাদ। ওর পাল্লায় পড়ে সেদিন পুরোটা বিকাল ধানমন্ডির শপিং মলগুলো চষে বেরিয়েছে দুজনে। পার্ক টাউনে ডিনার সেরেছে। সবশেষে বসুন্ধরা কমপ্লেক্সে নাইট শো তে মুভি দেখে বাড়ী ফিরতে রাত প্রায় বারোটা বেজে গিয়েছিলো। বেশ কিছু টাকা অতিরিক্ত খসে গিয়েছিলো আফ্রিদীর কিন্তু কোনো উপায়ও ছিলো না। আর কিছুদিন পরেই ওদের বিয়ে। বিয়ের প্রথম দিকের এসব চাওয়া পাওয়ার হিসাব সারাজীবন গুণতে হয়। নইলে বাকিজীবন ছোটো হয়ে থাকতে হয় স্ত্রী'র কাছে । সে কারনেই আনিয়াকে সেদিন বাধা দেয়নি। যা চেয়েছে তাই দিয়েছে। আনিয়াও প্রাপ্তির আনন্দে বিভোর হয়ে ছিলো সারাপথ।
একটু পরেই আবার ডাক পড়লো আফ্রিদীর। আরেকবার জুলফিকার ভুঁইয়ার মুখোমুখি হলো সে। যদিও তার দিকে তাকাতেও ইচ্ছে করছিলো না। কারন একটু আগেই ওকে বিশ্রী ভাষায় গালিগালাজ করেছে এই লোক। এখন তার চেহারায় ভিন্ন দীপ্তি। আফ্রিদীকে দেখেই চশমাটা নাকে নামিয়ে দিয়ে বললো-
-" প্লিজ সিট ডাউন...!"
-" না, ঠিকআছে! " আফ্রিদী বসলো না। জুলফিকার ওর রাগ দেখে হাসলেন। বললেন-
-" রাগ করবেন না আফ্রিদী সাহেব। আপনি এখনো বুঝতে পারছেন না আপনি কত বড় ঝামেলায় জড়াতে যাচ্ছেন। কারন অর্ডার আপনার টেবিল থেকে পাশ হয়। আপনি বিনা ইনকোয়্যারীতে বিল পাশ করেছেন মানে নিজের লাভের ভাগ বুঝে পেয়েই করেছেন!"
-" এসব কি বলছেন স্যার?"
-" আমি বলছিনা। আরেফীন স্যার বলছে। এ এম স্যার বলছে। এরা কেমন জাঁদরেল পাবলিক আপনি নিজেও ভালো করে জানেন। এরা এবার ছেড়ে কথা বলবে না। যে চারটা পায়ের উপর "পাশা'স হোম" দাঁড়িয়ে আছে। আরেফীন স্যার তার একজন। তিনি আপনার উদাসীনতায় এবার যথেষ্ট রুষ্ট। সো গেট রেডী..
!"
আফ্রিদী এবার ঢোক গিললো। সেটা দেখে জুলফিকার সামান্য হাসলেন। পুরো অফিস জুড়ে এসি চলছে। এই রুমেও বরফ জমানো ঠান্ডা অথচ আফ্রিদী ঘেমে নেয়ে একাকার।
জুলফিকার সোজা হয়ে বসে সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললেন-" আপনাকে সতর্ক করা আমার কাজ ছিলো সো আমি করলাম। এবার ডেস্কে যান। কাজ করুন। সপ্তাহখানেকের মধ্যে ইনকোয়্যারী টিম আপনার বাড়ী যাবে। আপনার প্রপার্টি, ইনকাম সোর্স এন্ড আদারস চেক করে যে রেজাল্ট দেবে সেটার উপর ভিত্তি করেই আপনার উপর এ্যাকশন নেয়া হবে। ভয় পাবেন না যা হবে সব ল' ফুলি হবে।"
-" স্যার, আপনি কি কিছুই করতে পারেন না এক্ষেত্রে? প্লিজ, স্যার! ডু সামথিং। আর কিছুদিন পরেই আমার বিয়ে। আমি অলরেডী ছুটির দরখাস্ত সাবমিট করেছি। সব শেষ হয়ে যাবে স্যার। আমার বর্তমান ভবিষ্যত এভরিথিং উইল বি ডিসট্রয়ড। প্লিজ স্যার!"
-" দেখুন, আমার ক্ষমতা খুবই সামান্য। আমি নিজেও গেস করতে পারছি যে ব্যপারটা অনিচ্ছাকৃত ভুল। বাট কাকে বলবেন এ কথা?বোকার মতো কিছু স্বার্থান্বেষী লোককে আপনি মাথায় কাঠাল ভেঙ্গে খাবার সুযোগ করে দিয়েছেন!"
-" আমি এখন কি করবো স্যার? সামনেই আমার বিয়ে...! আমার ছুটি...হানিমুন...?"
-" হানিমুউউন...? হা হা হা.....!
আপাতত ঘরের জানালা দিয়ে আকাশের মুন দেখতে থাকুন। ওভাবেও কিন্তু হানিকে নিয়ে মুন দেখা যায়। অফিসিয়াল অর্ডার ছাড়া ইউ কান্ট গো এনিহয়্যার! আমি দেখছি কি করা যায়! প্রানপণ চেষ্টা করবো বিষয়টা যেন কোলকাতা পর্যন্ত না যায়। কতটুকু পারবো জানি না। বাট আই'ল ট্রাই মাই বেষ্ট! "
ক্লান্ত পায়ে জুলফিকার ভূঁইয়ার রুম থেকে বেরিয়ে এলো আফ্রিদী। ডেস্কে এসে বসতেই ফোন বাজলো। আনিয়ার নাম্বার দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেলো। বিষন্ন মন নিয়েই রিসিভ করলো সে- " হ্যালো..!"
-" হাইই.....কি করছো? কখন বেরুবে অফিস থেকে!"
-" বলতে পারছিনা। কাজের খুব চাপ। তাছাড়া একটা বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে বুঝলে?"
-" ওফ্, এসব অফিসিয়াল বকবকানি আমার না একদম ভালো লাগে না। অফিসের কথা অফিসে! আমি কোনো সমস্যার গল্প শুনতে চাই না! এখন শুধু বেড়ানোর গল্প শুনতে চাই। এ্যাই শোনোনা, হানিমুনে আমরা যখন দার্জিলিং যাবো না তখন....!"
-" দার্জিলিং যাওয়া হবেনা আনি....! "
-" হোয়াট? এসবের মানে কি?"
-" মানে, অফিসে একটা প্রবলেম চলছে বললাম না? আমি পরে তোমাকে সব খুলে বলবো। দার্জিলিং যাবো না কেন অবশ্যই যাবো, বাট নট নাউ..! ওকে? সি ইউ লেইটার!" ফোন রেখে দুহাতে মুখ ঢাকলো আফ্রিদী। সামনে যে কি হতে যাচ্ছে কে জানে!
========
প্রতিদিন না হলেও সপ্তাহে অন্তত একটি দিন গোটা পাশা পরিবার নাস্তার টেবিলে জড়ো হয়। সেই দিনটি হলো রবিবার। কারন এদিনটি ওদের সাপ্তাহিক ছুটির দিন। প্রতি রবিবারে জিমদাল পাশা তার দুই ছেলেকে নিয়ে একসাথে নাস্তা করেন আর ব্যবসায়িক আলাপ আলোচনার জরুরী কাজটাও সেরে নেন। বড় ছেলে কামার পাশার উপর তার অগাধ আস্থা। কারন তার ব্যবসায়িক বুদ্ধিও অসাধারন। সত্যি বলতে কামার ছাড়া তিনি একরকম অচলই বলা চলে। কারন কামারকেই মাসের তিরিশটা দিন ঢাকা কোলকাতা নেপাল ব্যাংকক দৌড়াতে হয়। জিমদালের এক সময়কার ছোট্ট গার্মেন্টস এক্সেসরিজের বিজনেস আজকের এই সুবিশাল অবস্থানে আসার পেছনে কামারের অবদান অনস্বীকার্য্য। ছোট ছেলে ওমর আবার অতটা ব্যবসায়িক মানসিকতাসম্পন্ন নয়। সে কামারের তুলনায় অনেক বেশী সফট! জিমদালের মতে ওমর তার মায়ের স্বভাব পেয়েছে। কারো সাথে সহজে রুড হতে পারেনা। ওকে তাই কোলকাতার ব্রাঞ্চের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সে সেটাকেই সুন্দর সামলে রাখে ! যদিও এই ব্রাঞ্চের চেয়ারম্যান পদেও কামারকেই বহাল রেখেছেন তিনি, ওমর কেবল এম ডির পদটা সামলায়। অফিসিয়াল কাজগুলো ছাড়া ষ্টাফ ছাটাই বাছাই থেকে শুরু যাবতীয় প্রবলেমস কামারকেই দেখতে হয়। কারন এ জাতীয় ম্যাটারগুলো হ্যান্ডেল করার মতো যে পরিমাণ কূটনীতি প্রয়োজন ওমরের তা নেই, কামারের আছে এবং বেশ ভালো পরিমানেই আছে। ওমর নিজেও তা স্বীকার করে। এসবে তার কোনো আপত্তি নেই। বড় ভাইয়ের প্রতি সে যথেষ্ট অনুগতও। তবে করিৎকর্মা বড়ভাইটিরও এসব ঠিক থাকলেও নারী ঘটিত দিকগুলো খুবই বেঠিক! বলা যায় মারাত্মক। এটা আবার বাড়াবাড়ি পর্যায়ে গেলে সামলাতে হয় ওমরকেই । কামারের ব্যবসায়িক যোগ্যতা ওর নারীলোলুপতার নেশাকে ঢাকতে পারেনি। তবে ক্ষমতার প্রভাব কামারের নারীঘটিত দুর্ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হয়েই রয়ে যায়! কখনোবা একটু আধটু পত্রিকার শেষ পাতায় ঠাঁই পেলেও দ্বিতীয় দিনই তা উধাও হয়ে যায়। মোটা ডোনেশন দাতাকে কোন্ পত্রিকাই বা চটাতে চাইবে!
রবিবার সকালের এই পারিবারিক গেট টুগেদারে জিমদাল পাশার সাথে তাঁর স্ত্রী চন্দনা পাশাও তার পাশে থাকেন। দুই ছেলে আর স্বামীকে সেদিন নিজ হাতে স্পেশাল নাস্তা বানিয়ে খাওয়ান তিনি। এটা তার পারিবারিক ট্রাডিশন। চন্দনা সেদিন তার প্রিয় দুই পুত্রকে দুই পাশে বসিয়ে নিজ হাতে বেড়ে খাওয়ান। সেদিন বাড়ীর সার্ভেন্টসদের একটা অলিখিত ছুটি দেয়া থাকে। তারা কেউ এই পারিবারিক পরিবেশের আশেপাশেও থাকেনা। এটা অবশ্য চন্দনারই আদেশ। কারন তিন বাপ ছেলে মিলে এই সময়টাতে সারা সপ্তাহের সমস্ত বিষয়ে খোলামেলা আলাপ করে থাকে। চন্দনার মতে এসময় বাড়ীর সার্ভেন্টসদের উপস্থিতি একেবারেই অনাকাঙ্খিত। আজ কামারের ঢাকা যাবার বিষয়ে আলোচনা চলছে। ঢাকার মতিঝিল অফিস থেকে কয়েক কোটি টাকার ঘাপলামির খবর এসেছে জিমদাল পাশার কানে। খবরটা পেয়েই বড় ছেলে কামারপাশাকে ডেকেছেন তিনি। পিতাপুত্রের মিটিং শেষে স্থির হলো আগামী দুতিন দিনের মধ্যেই কামার ঢাকা যাবে। তবে ঢাকা যাবার আগেই সেখানকার এএম জুলফিকার ভুঁইয়াকে ফোন করে কিছু জরুরী নির্দেশ দিয়ে আগামী সোমবার একটা বোর্ড মিটিং কল করার আদেশ দিলো কামার।
আলাপ আলোচনার শেষ দিকে চন্দনা মৃদু ধমকের সুরে বললেন-" তোমাদের ভারী আলাপ শেষ হলে এবার হালকা আলাপে এসো। নাস্তার টেবিলে হালকা আলাপ হজমে সহায়তা করে। "
-" ওকে, তোমরা মা ছেলেরা আলাপ করো। আমি লিভ নিচ্ছি। " বলে জিমদাল তার ভারী শরীর নিয়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। চন্দনা বেল টিপতেই একজন দৌড়ে এলো জিমদালকে ধরে ঘরে নিয়ে যাবার জন্য।
ওমরপাশা হেসে বললো-" আপনার হালকা আলাপ ভাইয়ার জন্য ভারী হতে পারে আম্মি !" বলে কামারের দিকে তাকালো সে। কামারের চেহারার কাঠিন্য ঝরে গিয়ে তাতে শিশুসূলভ পবিত্রতা ফুটে উঠলো ক্ষণিকের জন্য। বোকার মতো প্রশ্ন করলো সে-" সেইং সামথিং টু মি?"
চন্দনা এবার বিরক্ত হয়ে বললেন-" বাংলায় কথা বল্! আমি ইংরেজী বুঝি কম!"
-" আচ্ছা, কি বলবেন বলেন আম্মি। স্যরি,আমি এ্যাবসেন্ট মাইন্ডেড....থুরি অন্যমনস্ক ছিলাম।"
-" তোর বিজনেস ট্যুর শেষ করে ফ্রি হবি কবে সেটা বল্। আমরা সবাই মিকদাদ ভাইয়ের মেয়েকে দেখতে যাবো। পছন্দ হলে 'রোকা' করে ফেলবো!"
-" বাহ্, না জান না প্যাহচান ম্যায় তেরা ম্যাহমান। আপ রোকা কিঁউ কারোগে?"
-" কামার? বাংলা কইতে কইসি!"
-" আপনি রোকা কেন করবেন ? আমি তো কোনো সিদ্ধান্ত দেইনি এখনো! তাছাড়া এখন আমার পক্ষে বিয়ে করা সম্ভব না। বিয়ে মানেই মরন। আচ্ছা, আপনি আমার পেছনে কেন লেগেছেন ? আপনার ছোটো ছেলেকে দিচ্ছেন না কেন? দাড়ী ফাড়ী রেখে সে তো বুড়ো হতে চলেছে। গোটা কোলকাতায় আপনি ওর জন্য আমাদের ঘরানার মেয়ে খুঁজে পাবেন না। আমার জন্য মেয়ের অভাব হবেনা। আপনি ওমরকে আগে খাল্লাস করুন !"
-" দিজ ইজ নট ফেয়ার ভাইয়া!" বলেই জিভে কামড় দিলো ওমর! "দুঃখিত, এটা কিন্তু ঠিক না ভাইয়া। তুমি আমার দু' দুটো বছরের বড়। তোমার আগে আমার বিয়ে মানে? ইটস...আঁ...এটা অসম্ভব। কি বলেন আম্মি?"
-" মন মতো মেয়ে পেলে তোদের দুটোকেই এক মজলিসে রোকা করিয়ে দিতাম। কোলকাতায় মেয়ে না পেলে ঢাকা থেকে আনবো। কিন্তু কামারের জন্য যেমন মেয়ে চাই ওমরের দরকার ঠিক এর উল্টো। আমাকে তো বুঝেশুনেই এগোতে হবে!"
ওমর এবার হেসে মা'কে পাশ থেকে জড়িয়ে ধরে বললো -" মেরী পেয়ারি আম্মি!"
-" হইসে। এখন বলো আজ লাঞ্চে কি নেবে তোমরা? আজ আমি নিজে রাঁধবো।"
-" আমি লাঞ্চ বাইরে সারবো আম্মি।" বলতে বলতে মুখে টিস্যু চেপে উঠে দাঁড়ালো কামার!
-" সপ্তাহে একটা দিনও তুই আমাকে দিবিনা?" চন্দনার বাক্যে এবার সত্যিকারের মাতৃত্বের হাহাকার ফুটে উঠলো।
-" ওকে, কথা দিচ্ছি! ডিনারে পাবেন। দ্যা ওয়ার্ড অব অনার...! " বলে কামার বেরিয়ে গেলো। চন্দনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওমরের দিকে তাকালেন-" তুই থাকছিস তো?"
-" অফ....অবশ্যই...মানে ইনশা...আল্লাহ!"
=====
জিনিসপত্রের বহর দেখে মেহেরের চোখ কপালে উঠলো। পুরো ঘর বিছানা জুড়ে শুধু জিনিস আর জিনিস। শুধু বিছানাতেই রয়েছে কসমেটিকস সামগ্রী। তিন সিটের সোফাটাতে জুতা আর পারফিউম। বাকি বক্স গুলো ফ্লোরে গড়াগড়ি খাচ্ছে। সেগুলো খুললে হয়তো পা ফেলার জায়গা থাকবেনা। মেহের জিনিসপত্রগুলো টপকে আনিয়ার কাছে এসে বললো-" এতোকিছু কিনেছিস কেন? এসবতো তুই আগামী এক বছরেও পরে শেষ করতে পারবি না। এটা তো বিরাট অপচয় রে...!"
-" আপ্পি, তুমি দয়া করে থামো তো! এসব আমার বিয়ের জিনিস। তুমি কি চাও, ফকিরনীর মতো একটা শাড়ী আর একটা জুতা পড়ে আমি রিক্সা দিয়ে শ্বশুড় বাড়ী যাবো?"
মেহের দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো-" শোন্, তোকে জান্নাতের নারীদের নেত্রীর বিয়ের গল্প বলি। যিনি ছিলেন পৃথিবীর সবচে সম্মাণিত মহিলাদের একজন। তিনি কে জানিস?"
আনিয়া কাঁধ ঝাঁকালো। মেহের বলে চললো-
-" তিনি হলেন বিবি ফাতিমা রাঃ! তাঁর বিয়ে কিভাবে হয়েছিলো জানিস? পরনের কাপড়টা পর্যন্ত মলিন ছিলো তাঁর । বিয়ে হয়েছিলো মসজিদে। কয়েক মাস পর আলী রাঃ তাঁকে তুলে নেবার ইচ্ছে প্রকাশ করলে নবীজি সাঃ তাঁকে স্বামীর ঘরে পাঠিয়েছেন তাও দাসী উম্মে আইমানের সাথে। তাঁকে বলেছিলেন- "ফাতিমাকে দিয়ে এসো! ' বিবি ফাতিমা রাঃ নিজেও জানতেন না যে তাঁকে ঐ দিন তুলে দেয়া হবে। বাবার আদেশে বিনা আয়োজনে নিরবে যাত্রা করেছিলেন দোজাহানের সর্দার মুহাম্মাদ সাঃ এর কন্যা, বেহেস্তী যুবকদের সর্দার হাসান হুসাইনের আম্মা। আলী রাঃ বেরিয়ে ওনাকে দেখে অবাক। তিনি সবিস্ময়ে বললেন-" একি..?"
উম্মে আইমান রাঃ বললেন-" নাও, নিজের আমানত সামলে রাখো!"
সেদিন কি নবী (সাঃ) দুচারঘর সাহাবীদের ডাকতে পারতেন না? ডাকলে তো তারা তাদের সর্বস্ব নিয়ে ছুটে আসতো! কিন্তু সেটা হয়ে যেতো উম্মতের জন্য কঠিন নিয়ম। রাসুল সাঃ তাঁর উম্মতের কন্যার পিতাদের জন্য মেয়ে তুলে দেয়াটাকে সহজ করে গেছেন। মেয়েকে পাত্রস্থ করতে যেন কোনো মেয়ের বাবার একটি পয়সা না লাগে। আজ কোথায় তার সুন্নত আর কোথায় আমরা! এজন্যই তো আমাদের সংসারে কেবল টাকার ঝনঝনানি বাজে, নেই ছিঁটেফোটা বরকত আর শান্তি !"
-" এসব আমাকে বলে লাভ কি? আমি কি একা গোটা সমাজ বদলে দিতে পারবো? তাছাড়া আমি এমন কি কিনেছি! আজকাল বিয়েতে এরচে বেশী কেনাকাটা হয়!"
-" তোকে বোঝানো বৃথা। আমরা তাঁদের মতো হতে না পারি! কাছাকাছি যাবার চেষ্টা তো করতে পারি!"
-" তোমার বিয়েতে তুমি এইসব করো। এবার আমাকে ক্ষান্ত দাও, প্লিজ। আমার মাথায় একটু তেল দিয়ে দাও তো! কাল সকালে শ্যাম্পু করবো। "
-" আমি? একটু কাজ ছিলো যে! আম্মু আমাকে সকালেই একটা কাজ দিয়েছে। জরিনা ডেকে বলে দেই ও তোকে তেল দিয়ে দিক!"
-" না না...! জরিনাকে দিয়ে তেল দিলে আমি আরাম পাইনা। তুমি দিলে আরামে ঘুম পেয়ে যায়! প্লিজ আপি!"
-" ওহো....তুই বড্ড বিরক্ত করিস আনি।" মুখে বিরক্তি প্রকাশ করলেও বোনের আব্দার ফেলতে পারলো না মেহের। কখনোই পারেনা। ছোট এই বোনটি মেহেরের হৃদয়ের অর্ধেক। ওর যাবতীয় বেয়াড়াপণা মেহেরকেই আড়াল করে রাখতে হয়। ওদের একসাথে দেখলে কেউ বলতেই পারবেনা যে ওরা সৎবোন!
চলবে....
-মোর্শেদা রুবী

Comments